হ্যাকারদের সম্ভাব্য প্রতিটি সাইবার আক্রমন থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা সম্ভব নয়, এর অন্যতম কারণগুলো হলো যে, নিরাপদ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা এবং সেই নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এমনকি সাইবার আক্রমনকারীরা সর্বদা নেটওয়ার্কগুলি লক্ষ্য করে আক্রমনের নতুন নতুন উপায় খুঁজতে থাকে এবং তাদের এই উন্নত পন্থা টার্গেটকৃত নেটওয়ার্কে সফল সাইবার আক্রমন চালাতে সাহায্য করে।

হ্যাকিং মানে কি?

হ্যাকিং হচ্ছে কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কে দুর্বলতা সনাক্ত করে উক্ত দুর্বলতার সুযোগ ব্যবহার করে সিস্টেমে অ্যাক্সেস লাভের ক্ষমতা। যেমন একটি সিস্টেমে অ্যাক্সেস করার জন্য পাসওয়ার্ড ক্র্যাকিংয়ের জন্য অ্যালগরিদমের সাহায্য নেয়া হয়।

আজকাল ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা এবং সফলতার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য কম্পিউটার ব্যবহারকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। আর প্রতিষ্ঠানের একাধিক কম্পিউটারের মধ্যে সংযুক্ত করার জন্যই নেটওয়ার্কের প্রয়োজন। এ নেটওয়ার্ক সিস্টেমের দুর্বলতা থাকলে তার ‍সুযোগ লুফে নেয় হ্যাকাররা। হ্যাকাররা হ্যাকিং করে অর্থ জালিয়াতি, চুরি-পাচার করে, গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেয়, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, যা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। আর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিস্টেমগুলো রক্ষার্থে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে হ্যাকারদের আক্রমন প্রতিহত করার জন্য।

হ্যাকার কে?

হ্যাকার এমন একজন ব্যক্তি যিনি কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের দুর্বলতা সন্ধান করেন এবং সেখানে অ্যাক্সেস লাভ করেন। হ্যাকাররা সাধারনত কম্পিউটার সুরক্ষার জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কম্পিউটার প্রোগ্রামার।

 

হ্যাকারদের তাদের কর্মের অভিপ্রায় অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ করা হয়। যেমন-

১) হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার (White Hat Hacker).

২) গ্রে হ্যাট হ্যাকার (Grey Hat Hacker).

৩) ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার (Black Hat Hacker).

 

হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার (White Hat Hacker):

হোয়াইট হ্যাট হ্যাকাররা মূলত নীতিবান, তারা তাদের প্রোগ্রামিং দক্ষতা ভালো, নৈতিক ও আইনি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে থাকে। এরা নৈতিকতার সাথে দক্ষতা প্রয়োগ করেন তাই এদের ‘ইথিক্যাল হ্যাকার’ও বলা হয়। হোয়াইট হ্যাট হ্যাকাররা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নেটওয়ার্কে প্রবেশর্পূবক বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং পন্থা বা দক্ষতা প্রয়োগ করে থাকেন যার ভিত্তিতে তারা উক্ত নেটওয়ার্ক সিস্টেমের ত্রূটি বা দুর্বলতা খুঁজে বের করে থাকেন এবং নেটওয়ার্কের দুর্বলতা হুমকি হবার আগেই নিরাপত্তাজনিত ত্রূটি বা দুর্বলতা ঠিক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষকে রির্পোট প্রদান করে থাকে।

একজন ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার যে পন্থায় সিস্টেম হ্যাক করে থাকে ঠিক একই পন্থায় হোয়াইট হ্যাট হ্যাকাররাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সিস্টেম হ্যাক করে এর ত্রূটি সংশোধনের পথ বাতলে দেন। যার ফলে কম্পিউটার ও নেটওর্য়াকিং সিস্টেম, ওয়েবসাইট ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের আক্রমনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচা যায়। কিছু সংগঠন হোয়াইট হ্যাট হ্যাকারদের পুরস্কৃত বা পুরস্কার প্রদান করে যখন তারা তাদের দুর্বলতার কথা তাদের অবহিত করেন। আরেকটি বিষষ হলো হোয়াইট হ্যাট হ্যাকারের কার্যক্রম কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে হয় তাই এ ধরনের হ্যাকিং পদ্ধতি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না।

 গ্রে হ্যাট হ্যাকার (Grey Hat Hacker):

গ্রে হ্যাট হ্যাকাররা মূলত শখের বসেই কিংবা নিজেদের বড়ত্ব প্রমাণে এই হ্যাকিংয়ের কাজ করে থাকে। এরা অনেকটা দু‘মুখো সাপের ন্যায়।

গ্রে হ্যাট হ্যাকাররা যখন কোন সিকিউরিটি সিস্টেমের ত্রূটি খুঁজে পাবে তখন সে তার মন কি চায় সেভাবেই কাজ করবে। সে ইচ্ছে করলে ঐ সিকিউরিটি সিস্টেমের ত্রূটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহতিও করতে পারে আবার নিরাপত্তাজনিত ত্রূটির সুযোগে সিস্টেমের ক্ষতিসাধন করবে অথবা নিজেদের বড়ত্ব জাহিরের জন্য তা জনসম্মুখে উক্ত সিস্টেমের ত্রূটি প্রকাশ করে দিবে। অনেক সময় সিস্টেমের ত্রূটি প্রকাশ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসাধন হয় এমনকি ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের জন্য উক্ত প্রকাশ পাওয়া তথ্য তাদেরকে উক্ত সিস্টেমে আক্রমনের পথ সুগম করে দেয়। অধিকাংশ হ্যাকাররা এই গ্রে হ্যাট হ্যাকার শ্রেণীভূক্ত এবং তারা সাধারনত কারো ক্ষতি খুব একটা করে না তবুও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হ্যাকিং করে থাকে তাই এটাও অপরাধ।

ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার (Black Hat Hacker).

ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের অভিপ্রায় পুরোটাই ক্রাইম এবং ভয়ংকর। ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকাররা কম্পিউটার সিস্টেম ও নেটওয়ার্ক হ্যাকিং করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নানান অপরাধে লিপ্ত হয়। যেমন-ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড চুরি, ব্যক্তিগত তথ্যাদি চুরি করে তা অপর পক্ষের কাছে প্রকাশ করা, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আক্রমন চালিয়ে ওয়েবসাইটের বারোটা বাজানো, কম্পিউটারে ভাইরাস ছড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি। মূলত সাইবার ক্রিমিনাল বলতে ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদেরই বুঝানো হয়।

 

আরো কিছু ভিন্ন প্রকারের হ্যাকারও রয়েছে, তাদের পরিচয় কি?

Script kiddies: এরা মূলত অদক্ষ হ্যাকার শ্রেণী যারা ইতিমধ্যে তৈরি হ্যাকিং টুলস ব্যবহার করে সিকিউরিটি সিস্টেমে অ্যাক্সেস করে।

Phreaker: আগেতো কম্পিউটারের এত প্রচলন ছিলনা তখন হ্যাকাররা ফোন হ্যাকিং করত।ফোন হ্যাকারদের বলা হত Phreaker এবং এ প্রক্রিয়া কে বলা হয় Phreaking। এরা বিভিন্ন টেলিকমনিকেশন সিস্টেমকে হ্যাক করে নিজের প্রয়োজনে ব্যাবহার করত।

Crackers: এদের শখ বা পেশাই হচ্ছে বিভিন্ন পাসওয়ার্ড ভাঙ্গা এবং Trojan Horses তৈরি করা এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক সফটওয়্যার তৈরি করা। ক্ষতিকারক সফটওয়্যারকে Warez বলে। এসব ক্ষতিকারক সফটওয়্যারকে তারা নিজেদের কাজে ব্যবহার করে অথবা বিক্রি করে দেয় নিজের লাভের জন্য।

নীল টুপি হ্যাকার (Blue Hat Hacker): এরা আসলে হ্যাকিংয়ের সাথে তেমন জড়িত নয়। কোন সফটওয়ার বা সিস্টেম শুরু করার পূর্বে এরা ঐ সফটওয়ার বা সিস্টেমের খারাপ বা ক্ষতিকারক দিকগুলো যাচাই বাছাই করে তা শোধরানের চেষ্টা করে।

নিওফাইট বা নোব (Neophyte or nOOb): এরা হ্যাকিং শিক্ষার্থী। এরা হ্যাকিং কেবল শিখছে। অন্য অর্থে এদের বিগিনার বা নিউবাই বলা যায়।

Hacktivist: এই শ্রেণীর হ্যাকাররা সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর জন্য হ্যাকিংকে ব্যবহার করেন। একটি সামাজিক ওয়েবসাইট হাইজ্যাকিং করে হাইজ্যাকেড ওয়েবসাইটে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বার্তা প্রর্দশন করে দেয়।

এলিট হ্যাকার (Elite Hacker): মোটকথায় এরা  একাই একশো। এদের সব নিজেদের তৈরি, আর এদেরকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেও থাকে না, এরা হ্যাকিংয়ের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।

 

সারকথা:

হ্যাকাররা যখন সংগঠিত হয় তখন তারা সংগঠিত হ্যাকারে (Organized Hackers) পরিণত হয় এবং এই ধরনের হ্যাকাররা সাইবার অপরাধীদের সংগঠন, হ্যাক্টিভিস্ট, সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক হ্যাকারদের অন্তর্ভুক্ত। সাইবার অপরাধীরা সাধারণত নিয়ন্ত্রণকারী, ক্ষমতা এবং সম্পদের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা পেশাদার অপরাধীদের গোষ্ঠী। অপরাধীরা অত্যন্ত অত্যাধুনিক এবং সুসংগঠিত এবং এমনকি তারা  অন্য অপরাধীদের সেবা হিসাবেও সাইবারক্রাইম প্রদান করতে পারে। হ্যাক্টিভিস্ট তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য রাজনৈতিক বিবৃতি তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক আক্রমণকারীরা তাদের সরকারের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে বা ধ্বংস করে দেয়। এই আক্রমণকারীরা সাধারণত উচ্চতর প্রশিক্ষিত এবং ভালভাবে অর্থায়নে পরিচালিত হয় এবং তাদের আক্রমণ নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলির উপর নিবদ্ধ থাকে যা তাদের সরকারের জন্য উপকারী।