বহুল কাঙ্ক্ষিত ফোর-জি সেবায় ইন্টারনেটের সুপার হাইওয়েতে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু কোটি কোটি মোবাইল গ্রাহকই বঞ্চিত হবেন ফোরজি সুবিধা থেকে। লেখাটি পড়লে বিস্তারিত জেনে যাবেন কারা হচ্ছেন বঞ্চিত আর সৌভাগ্যবান যিনি।

ফোরজি হচ্ছে বর্তমান সময়ের ইন্টারনেটের সব থেকে আধুনিক টেকনোলজি। ফোর-জি হচ্ছে ফোর্থ জেনারেশন বা চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল ফোন প্রযুক্তি। আর ফোর্থ জেনারেশন মানেই হাই রেজুলেশন মোবাইল ডিজিট। এর আগের প্রজন্মের প্রযুক্তি ছিল টু-জি এবং থ্রী-জি। টু-জিতে কেবল ফোন কল করা এবং টেক্সট মেসেজ পাঠানো যেত। এরপর থ্রী-জি প্রযুক্তিতে মোবাইল ফোন থেকে ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ভিডিও কল করা এবং মিউজিক এবং ভিডিও ডাউনলোড করার সুযোগ তৈরি হয়।

মোবাইল ফোনের থ্রী-জি’তে যা যা করা সম্ভব, এককথায় তার সবকিছু ফোর-জি’তেও করা যাবে, তবে দ্রুতগতিতে এবং ভালোভাবে। ফোর-জিতে থাকা মানেই  এইচডি লাইভ হবে নিরবিচ্ছিন্ন। ফোর-জি মানেই শেয়ার ব্যান্ডউইথ। আগে থ্রিজিতে যেখানে সবার জন্য ছিল একটি কমন রাস্তা, সেখানে ফোর-জিতে সবার জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ডেলিকেটেড রাস্তা। তার মানে ফাইল  ট্রান্সফার, ভিডিও ট্রান্সফার, আপলোড, ডাউনলোড সবই হবে অনেক দ্রুত।

ফোর জিতে লেটেনন্সি রেট (Reduced latency – Pages take less time to load so less buffer time) অনেক কম, তাই ডাটা প্রসেস হবে অনেক তাড়াতাড়ি। তাই মাল্টি প্লেয়ার গেইমিং আর মাল্টি ভিডিও কলিং  অথবা ভিডিও কনফারেন্স হবে যখনতখন এবং খুবই স্বচ্ছ। পাশাপাশি কলড্রপের হারও কমবে। ফোন কলের মান হবে অনেক ভালো, ভিডিও কল করা যাবে ভালোভাবে।

বলা হচ্ছে, ফোর-জি সেবা চালু হলে ইন্টারনেটের গতি বাড়বে, ভয়েস কলের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ থাকবে। আর এতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি লাভবান হবেন ই-কমার্স খাত সংশ্লিষ্টরা।

‘ফোর-জি’র মাধ্যমে আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংস ধারণার প্রসার ঘটবে। বাইরে থেকে মোবাইল বা ডিভাইসের মাধ্যমে ঘরের দরজা লক, ফ্যান নিয়ন্ত্রণ, গ্যাসের চুলা ঠিকঠাক আছে কিনা- এসব কাজ হাতের নাগালে চলে আসবে’। এমনকি, টেলিমেডিসিন থেকে শুরু করে মোবাইল এডুকেশন বা ই-লার্নিংয়ের মতো কাজগুলো খুবই সহজ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশে থ্রিজি প্রযুক্তির আরেকটি বড় বাধা- এখানে এই সেবা প্রযুক্তি স্পেকট্রামের যে ব্যান্ডে দেওয়া হয়েছে (২১০০ ব্যান্ড) তার বড় দুর্বলতা হলো এটি পাশাপাশি উঁচু ভবন থাকলে বেজ স্টেশন বা টাওয়ারের মাঝে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে যায়। তাই নেটওয়ার্ক ভালো পাওয়া যায় না। ফলে শহরের বড় বড় ভবনের অলি-গলিতে নেটওয়ার্কও ভালো মেলে না।

ফোরজিতে এখানেই সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হবে। কারণ, অপারেটররা যে কোনো ব্যান্ডেই ফোরজি সেবা দিতে পারবেন। ফলে ভালো নেটওয়ার্কের বড় অগ্রগতি হবে এর মাধ্যমে। কথা বলা এবং ইন্টারনেট ব্যবহার– দুই ক্ষেত্রেই তা হবে।

টেলিকমিউনিকেশন্সে ‘টেকনোলজিক্যাল নিউট্রালিটি’ বলে একটি টার্ম আছে। যার মানে দাঁড়ায় যে কোনো স্পেকট্রাম ব্যান্ডে যে কোনো সেবা দেওয়ার সুযোগ। বাংলাদেশে এতোদিন এটি ছিলো না। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি স্পেকট্রাম নিলামের সময় থেকে এটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে একে তো অপারেটর তার হাতে থাকা স্পেকট্রাম দিয়ে ইচ্ছে মতো নেটওয়ার্কের ডিজাইন করতে পারবেন;

দ্বিতীয়ত, টেকনোলজিক্যাল নিউট্রালিটি এমনিতেই স্পেকট্রামের ইফিসিয়েন্সি বা কার্যক্ষমতা দেড় থেকে দুইগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিবে। এতে করে বিদ্যমান স্পেকট্রাম দিয়েই অপারেটরা গ্রাহকদের সন্তুষ্টির কাছাকাছি চলে যেতে পারবে।

প্রযু্ক্তিবিদরা বলছেন যে, প্রথম দিকে হয়তো গতি ঠিক থাকবে, তবে গ্রাহক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গতি ও মান যেন খারাপ না হয় সেদিকে অপারেটরদের দৃষ্টি দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিতে হবে।

তারা আরো বলেন, ফোর-জি সেবা চালু হবে, কিন্তু অনেক জায়গায় এখনও থ্রি-জি সেবা পাওয়া যায় না। অপারেটরগুলো এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করি।

 

 

বাংলাদেশে ফোরজি’র সুবিধার দুটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন।

প্রথম চ্যালেঞ্জ- স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগেরই ফোর-জি সুবিধাসম্পন্ন সেট ও সিম না থাকাও একটি চ্যালেঞ্জ। সমস্যায় রয়েছেন আইফোন ব্যবহারকারীরাও।

দেশে যতো হ্যান্ডসেট ব্যবহার হচ্ছে তার মাত্র দশ শতাংশের মতো সেটে ফোরজি সেবা গ্রহণ করতে সম্ভব। গ্রামীণফোনের সিইও গত ১৯ ফেব্রুয়ারী দাবি করেছেন যে, তাদের গ্রাহকদের ১৪ শতাংশের হাতে ফোরজি সেট রয়েছে।

আর দেশের সব মোবাইল সেট ফোর-জি এনাবেল নয়, তাই ফোর-জি সুবিধা নিতে চাইলে একটি বড় সংখ্যক গ্রাহককে ফোর-জি এনাবেল সেট কিনতে হবে এবং নতুন করে সিম বদল করে নিতে হবে। টাকা দিয়ে কি গ্রাহকরা আবার আরেকটা ফোনসেট কিনবেন, সেটাই একটা বিরাট প্রশ্ন?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে এখন যে সব মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে, তার মাত্র ১০ থেকে ১৫ ভাগ ফোর-জি সমর্থিত। অর্থ্যাৎ ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ মোবাইল গ্রাহক ফোর-জি সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি গ্রাহক স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে মাত্র ১০ ভাগ ফোন ফোর-জির ফ্রিকোয়েন্সি ধারণ করতে সক্ষম।

তবে মোবাইল ফোন আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, বাজারে এখন ১০ হাজার টাকার ওপরে যেসব স্মার্টফোন পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর সবই ফোর-জি সমর্থিত।

দেশে গ্রামীণফোনের সাড়ে ৬ কোটি, রবির ৪ কোটি ২০ লাখ, বাংলালিংকের ৩ কোটি ২০ লাখ এবং টেলিটকের ৪৪ লাখ গ্রাহক রয়েছে।

আপনার হ্যান্ডসেটের ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা ঠিক আছে, তারপরও দেখছেন সেটিতে ফোর-জি চলছে না। সেটা কেন?

উত্তর, এক কথায়, স্মার্টফোনটি ফোর-জি সমর্থিত করে তৈরি করা হয়নি।

কিন্তু, ফোর-জি সিম নিয়েছেন, হ্যান্ডসেটও ফোর-জি সমর্থিত। তারপরও ফোর-জি চলছে না। সেক্ষেত্রে কি করবেন?

জানা গেছে, ফোর-জি নেটওয়ার্কের মাঝে বেশ কিছু ধরণ ও সংস্করণে পার্থক্য রয়েছে। আর এর ফলে ফোন ফোর-জি সমর্থিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা বাংলাদেশে ফোর-জি ব্যবহার করতে পারবেন না।

বাংলাদেশে ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতেই ফোর-জি সেবা দেবে অপারেটররা। এজন্য শুধুমাত্র এসব গ্রাহকরাই ফোর-জি সেবা নিতে পারবেন। আর এই তিনটি ফ্রিকোয়েন্সি ও ব্যান্ড ইউরোপে বহুল প্রচলিত।

ফলে ইউরোপীয় সংস্করণের ফোনগুলোতে ফোর-জি ব্যবহার করা যাবে। তবে চীনা সংস্করণগুলো এফডিডিএলটিই সমর্থন না করায় তাতে ফোর-জি চলবে না। আবার আমেরিকা থেকে আসা ফোনগুলোর মাঝে সবগুলো সংস্করণ ফোর-জি সেবা দিতে পারবে না।

তবে যারা বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি করা ফোর-জি সমর্থিত স্মার্টফোন কিনেছেন, তাদের চিন্তার কিছু নেই। এসব ফোনে সরাসরি ফোর-জি কাজ করবে।

এর বাইরে ফোর-জি নিয়ে আইফোন গ্রাহকদের জন্য দুঃসংবাদ রয়েছে। ফোর-জি সুবিধা সহসাই মিলছে না তাদের। বাংলাদেশের কান্ট্রিকোডে আইফোনের ফোর-জি সেবা সংক্রান্ত কারিগরি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে না উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আইফোন কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে জানিয়েছে, এজন্য এক থেকে দেড় মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।

 

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো- ডাটা পরিবহনের জন্যে অপারেটররা মূলত ফাইবার অপটিক ক্যাবলই ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু আইনগত বাধ্যবাধকতায় তারা নিজেরা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসাতে পারেন না। এমনকি দেশে ফাইবার নেটওয়ার্কও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফোরজি বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ সেবায় বড় অগ্রগতি নিয়ে আসবে- সেটি বলা যায় নিঃসন্দেহে।

থ্রিজি যেমন ইন্টারনেটের গতি-ই বাড়ায়নি, সেই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নতুন নতুন সেবাকে ইন্টারনেটের ওপর তুলে দিয়েছে। ফোরজিতেও দেখবেন অনেক প্রচলিত সেবা ইন্টারনেট-ভিত্তিক হয়ে যাবে। আর পার্থক্যটা বোঝা যাবে তখনই।

আরো একটি বিষয় হলো ফোরজি চালু হলে যারা ফোরজি ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন তারা মূলত বড় ভলিউমের ইন্টারনেটই ব্যবহার করবেন। এতোদিন তারা থ্রিজি ব্যবহার করতেন। তারা থ্রিজি থেকে ফোরজিতে চলে আসলে থ্রিজি’র স্পেকট্রামের ওপর চাপ কমবে এবং যেখানে ফোরজি নেটওয়ার্ক থাকবে না সেখানে থ্রিজি পরিস্থিতিও আগের চেয়ে ভালো হবে।